বাজেট:2015-16 . অবহেলিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
বেতন-ভাতা ও সুদ পরিশোধের মতো অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর বরাদ্দ। যদিও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেও মানবসম্পদ উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের গুরুত্বের কথা বলেছেন।
বেতন-ভাতা ও সুদ পরিশোধের মতো অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর বরাদ্দ। যদিও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেও মানবসম্পদ উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের গুরুত্বের কথা বলেছেন।
আবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত বরাদ্দ কমলেও বেড়েছে প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বাজেট দ্বিগুণ করা হয়েছে। সামান্য হলেও কমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরাদ্দ। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের নতুন বাজেট দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গতকাল শুক্রবার বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন করে কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় কঠোর সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাজেটে সবচেয়ে অবহেলিত খাতের একটি হচ্ছে স্বাস্থ্য।
দুরবস্থা কৃষি খাতেও। সিপিডির পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট বাজেটে সামগ্রিক কৃষি খাতের অংশ ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে তা নেমে হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বরাদ্দের বড় অংশই ভর্তুকি।
স্বাস্থ্য খাত: নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে তা ছিল ১১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার মোট বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ বিদায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বরাদ্দ ছিল ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আবার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ একই রকম আছে, দশমিক ৭৪ শতাংশ। পাঁচ বছর আগেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহউপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি বলেন, ‘বাজেট দেখে মনে হয় স্বাস্থ্যের দিকে সরকারের কোনো নজর নাই, মনোযোগ নাই। এই বরাদ্দে চিকিৎসা নিতে মানুষের পকেটের খরচ বাড়বে। এতে দরিদ্র রোগীদের সেবা পাওয়া কঠিন হবে।’
শিক্ষা খাত: প্রস্তাবিত বাজেটে টাকার অঙ্কে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা ছিল ১৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা ১৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি এক করে দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাত বরাদ্দ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
এবারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ। আর আগের অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। ইউনেসকোর সুপারিশ হচ্ছে, শিক্ষা খাতে একটি দেশের বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
অথচ বাজেট বক্তৃতায় মাধ্যমিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রথমেই বলতে হবে, প্রাথমিক শিক্ষার পরেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক শিক্ষায় মানসম্মত শিক্ষকের অভাব খুবই প্রকট। তৃতীয়ত, এই স্তরে শিক্ষার মান বেশ নিম্ন পর্যায়ে আছে। বক্তৃতায় গুরুত্ব পেলেও বরাদ্দে গুরুত্ব পেল না এই শিক্ষা খাত।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সরকারের করা বিভিন্ন পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথাও বলেছেন। কিন্তু বরাদ্দ বাড়িয়েছেন কম।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া উচিত- এটা যেমন আমরা বলি, তেমনি সরকারও বলে। সরকারকে সেটা প্রমাণ করতে হবে। এখন দেখা যায়, বাজেটের আকার বাড়লে সবকিছুর বরাদ্দই বাড়ে, শিক্ষায়ও বাড়ে। এটা না করে আনুপাতিক হার ও পরিমাণ- দুই দিক থেকেই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
নতুন বাজেটে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ছিল ৮৪৮ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন রয়েছে। এ কারণেই বাজেট বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান। তিনি জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে নয়টি করে ওয়ার্ড থাকে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ভোটকেন্দ্র করতে হয়। পৌরসভারও একই অবস্থা। ফলে বেশি বাজেটের প্রয়োজন হয়।
এদিকে, নতুন অর্থবছরে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বেতন-ভাতা। মোট বরাদ্দের ২৩ শতাংশই খরচ হবে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে। এর আগে সুদ পরিশোধ ছিল বরাদ্দের সবচেয়ে বড় খাত, প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ। আর এক বছর আগেও বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়েছে ১৭ শতাংশ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন